মোবাইল আসক্ত হচ্ছেন নিজের অজান্তে; মুক্তির উপায় এখানে

Share This News

আমরা সাধারণত মাদকাসক্তের কথা শুনেছি কিন্তু এখন বহুল আলোচিত একটি বিষয় হচ্ছে মোবাইল আসক্তি। সাধারণত এই মোবাইল আসক্তি সম্পর্কে আমরা অনেকেই অজ্ঞাত।করোনাকালীন সময়ে আমাদের তৈরি হয়েছে ভার্চুয়াল এক জগৎ, যার ফলে আমরা অনেকে আসক্ত হয়ে পড়েছি অনলাইন দুনিয়ায়। আর এই আসক্তি কেড়ে নিচ্ছে আমাদের মূল্যবান সময় এবং আমাদের এক সুন্দর ক্যারিয়ার।


সাধারণত সব বয়সের লোকেরাই এই মোবাইলের প্রতি আসক্ত হতে পারে ।তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় স্কুল পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রী এবং যুবকরাই এই মোবাইলের প্রতি আসক্ত বেশি।অনলাইনে বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক গেমের কারণে অনেকে আসক্ত হচ্ছে মোবাইলের প্রতি।


বর্তমান সময়ের মোবাইল আসক্তি মানসিক অসুস্থতার একটি বিশেষ রূপ হিসেবে ধরা হচ্ছে।এক গবেষণায় দেখা গেছে মার্কিন যারা মোবাইল ব্যবহারকারী আছে তারা ৬০ মিনিটের বেশি সময় মোবাইল চেক না করা ছাড়া থাকতে পারে না। এছাড়া আমেরিকার ৮২% লোক বিশ্বাস করে যে তাদের মধ্যে মোবাইল আসক্ততা বিদ্যমান রয়েছে।


অনেকে নিজের কাজের প্রতি মন দিতে পারছে না এই মোবাইল আসক্তির কারণে। যারা ছাত্র-ছাত্রী আছে তারা তাদের পড়ার মধ্যে পূর্ণরূপে মনোযোগ দিতে পারছেনা মোবাইল আসক্তির কারণে, যার ফলে ছাত্র-ছাত্রীদের পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে এই যে মোবাইল আসক্তি নিজের মধ্যে আছে কিনা অনেকে জানেনা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আপনি কি মোবাইলে আসক্ত?
নিচের কয়েকটি বিষয় নিজের সাথে মিলিয়ে নিতে পারেন যে আপনি কি মোবাইল আসক্ত কিনা-

  • যদি মোবাইল হাতের কাছে না থাকাতে আপনার মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি মনে হয়।
  • যদি আপনার মোবাইল চালানোর ব্যাঘাত হওয়ার কারণে আপনি মানসিকভাবে অনেক রাগান্বিত হয়ে থাকেন।
  • আপনার সাথে বসে থাকা কোন ব্যাক্তিকে বাদ দিয়ে যদি আপনার মোবাইলকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন বেশি।
  • খুব গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় উপেক্ষা করে আপনি যদি মোবাইলে প্রতি মনোযোগ দিয়ে থাকেন।
  • আপনি কি প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০ বার আপনার ফোনটি চেক করেন কিংবা প্রতি ১০ মিনিটে অন্তত একবার?
  • যদি মোবাইলে সময় দেওয়া কি আপনার কাছে সময় অপচয় না মনে হয়।
  • মাঝেমধ্যে আপনি কি মধ্যরাতে আপনার ফোনটি চেক করেন?
  • প্রতিদিন কমপক্ষে ৬ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন মোবাইল পেছনে?
  • আপনি যখন কাউকে কল কিংবা মেসেজ দিচ্ছেন কিন্তু দ্রুত সাড়া না আসলে রাগ হচ্ছেন?


উপরের বিষয়গুলো সাথে যদি আপনার সাথে হয় তাহলে হতে পারে আপনি আসক্ত অথবা যদি আপনার নিকট আত্মীয় কেউ আসক্ত থাকে। এবার আমরা জেনে নিবও এক্ষেত্রে আমাদের করণীয়।
মোবাইল আসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার কিছু উপায় সম্পর্কে আমরা আলোচনা করব এখন-


প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে দেওয়া মোবাইল ব্যবহারের জন্য-

সাধারণত আপনি যখন নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মোবাইল চালাবেন তখন আপনার মধ্যে মোবাইল আসক্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। আর আপনি যদি পূর্বে মোবাইলের আসক্ত হয়ে থাকেন তাহলে এটাও ধীরে ধীরে কমে যাবে। একটা নির্দিষ্ট সময়ে মোবাইল চালানোর কারণে আপনার অন্যান্য কাজগুলোতে ব্যাঘাত ঘটবে না। আপনি আপনার কাজগুলোকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করতে পারবেন। এছাড়া আপনি আপনার সময়ের যথাযথ ব্যবহার করতে পারবেন
আপনার নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবহারের জন্য একটি এনালগ মোবাইল ব্যবহার করতে পারেন। সাধারণত এনালগ মোবাইল গুলোতে মোবাইল আসক্ত সম্ভাবনা একেবারে থাকেনা।

কিছু নির্দিষ্ট সময় মোবাইল ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন

আপনি যখন কারো সাথে কথা বলছেন তখন মোবাইল ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন এবং যার সাথে কথা বলতেছেন তাকে প্রাধান্য দেওয়ার চেষ্টা করুন। যে সময় পড়ালেখা করছেন ওই সময়ে আশেপাশে মোবাইল রাখবেন না। অফিসের যথাসম্ভব মোবাইল ব্যবহার এড়িয়ে চলুন।বিশ্রাম নেওয়ার সময় মোবাইল ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন। বেডরুমে মোবাইল রাখা থেকে বিরত থাকুন

নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন
আপনার মোবাইলে যখন ফেসবুক টুইটার কিংবা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া থেকে কোন নোটিফিকেশন আসে তখন আপনার অবচেতন মন আপনাআপনি আন্দোলিত হয় এবং আপনার মনোযোগ সম্পূর্ণ চলে যায় আপনার মোবাইলের প্রতি। তাই আপনার মোবাইলের যেসকল সোশ্যাল মিডিয়া আছে সেগুলোর নোটিফিকেশন বন্ধ করে রাখতে পারেন।অবিরাম নোটিফিকেশন পেতে থাকলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়।প্রতি মিনিটে মিনিটে আসা এসব নোটিফিকেশন মোবাইলের প্রতি আরও বেশি আগ্রহী করে তোলে। তাই মোবাইল ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হলে অবশ্যই ফোনের নোটিফিকেশন অফ করে রাখতে হবে।

নির্দিষ্ট কিছু অ্যাপ ডিলিট করে রাখুন-
আপনার সর্বাধিক ব্যবহৃত অ্যাপ্লিকেশনগুলো ডিলিট করে দিতে পারেন।আপনার স্মার্টফোনটি এনালগ ফোনে পরিণত করতে পারেন। যে সকল অ্যাপে আপনি বেশি সময় দিচ্ছেন যে সকল কারণে আপনি ব্যবহার করছেন সেগুলো থেকে আপাতত কয়েক মাস বিরত থাকুন।
মোবাইলে যদি প্রতিযোগিতামূলক কোন খেলার গেমস থাকে তাহলে সেগুলো ডিলিট করুন। সাধারণত যুবকরা প্রতিযোগিতামূলক গেমসের কারণে মোবাইলে প্রতি আসক্ত হয়ে যায়।

গ্রুপ চ্যাট গুলো মিউট করে রাখুন-

সাধারণত আমরা অনেকের সাথে যোগাযোগ রক্ষায় ফেসবুক কিংবা অন্যান্য যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে আমরা নিজের একটা গ্রুপ তৈরি করি। যার ফলে এই গ্রুপে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অনেকেই মেসেজ দিয়ে থাকে যার ফলে আপনার কাজ করার ব্যাঘাত ঘটে। তাই আপনি এই গ্রুপগুলো নোটিফিকেশন অফ করে রাখুন। পরবর্তীতে আপনার সময় অনুযায়ী আপনি গ্রুপে ঢুকে প্রয়োজনীয় তথ্য গুলো চেক করে নিতে পারেন

বেশি অ্যাপ ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন-
মোবাইলে খুবই প্রয়োজনীয় অ্যাপ গুলো ব্যতীত অন্য কোন অ্যাপ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন। মোবাইলে যত বেশি অ্যাপ থাকবে আপনি মোবাইলের প্রতি ততো বেশি আকৃষ্ট হবেন। এবং আপনি প্রতিদিন প্রতিদিন কিছু না কিছু সময় ব্যয় করার চেষ্টা করবেন এর ফলে আপনার সময় অপচয় হবে কাজে ব্যাঘাত ঘটবে।

অ্যালার্ম ঘড়ি হিসাবে আপনার ফোন ব্যবহার করবেন না-
আপনি যখন অ্যালার্ম ঘড়ি হিসেবে মোবাইল ঘুমানোর সময় আপনার পাশে রাখবেন তখন আপনার রাত্রে মন চাইবে একটু মোবাইল চালানোর ।আপনার অবচেতন মন তখন আপনার মাঝে নানা ধরনের ধারণা তৈরি করে আপনাকে মোবাইলের চালাতে উদ্বুদ্ধ করবে। তাই অ্যালার্ম এর জন্য অ্যালার্মঘড়ি ব্যবহার করতে পারেন।
সবচেয়ে মজার একটা বিষয় হচ্ছে পৃথিবীতে সবচেয়ে দামি অ্যালার্ম ঘড়ি হচ্ছে মা।
আপনি আপনার মাকে একটা নির্দিষ্ট সময় ঘুম থেকে উঠাতে বলেন আধঘন্টা থেকে আপনাকে উঠানো শুরু করবে।

একটি হাত ঘড়ি ব্যবহার করুন-
একটি হাতঘড়ি আপনার ব্যক্তিত্বের অনেক বড় পরিচায়ক। আপনি যখন একটি হাত ঘড়ি ব্যবহার করবেন তখন আপনাকে স্মার্ট লাগবে। আর আপনি যখন হাত ঘড়ি ব্যবহার করবেন তখন সময় দেখার জন্য আপনাকে বারবার মোবাইল দেখতে হবে না।

ব্যাইয়াম করার অভ্যাস গড়ে তুলুন-

প্রতিদিন বিকেলে ব্যায়াম অথবা খেলাধুলায় নিজেকে ব্যস্ত রাখুন। বিকেলে ব্যায়াম এবং খেলাধুলা করলে রাত্রে ঘুম ভালো হয়। এবং যেটুকু সময় আপনি ব্যায়াম করলে বা খেলাধুলা করবেন সেটুকু সময় আপনি মোবাইল থেকে বিরত থাকবেন।

বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন-
আপনি যখন বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলবেন তখন আপনি মোবাইল আসক্তি থেকে অনেকটাই বেঁচে যাবেন। বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলে এত লাভ বর্ণনা করা অসম্ভব।আপনি কয়েকটি ভালো বই বেছে নিন এবং সেগুলো প্রতিদিন পড়ার চেষ্টা করুন। বিশেষ করে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে পড়লে আমাদের মস্তিষ্কে অনেকটাই ক্লান্ত হয়ে যায় যার ফলে রাত্রে ভালো ঘুম হয়।

কাজ শুরু করার আগে আপনার ফোনটি কমপক্ষে ১০ ফুট দূরে রাখুন-
আপনি যখন কোনো কাজ করছেন তখন তার থেকে দূরে মোবাইলটা রাখুন,মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এরিক অ্যালটম্যান আবিষ্কার করেছেন যে, মাত্র 2.7 সেকেন্ডের বাধা আপনার কাজের ত্রুটির হার দ্বিগুণ করে। তাই কাজ শুরুর পূর্বে আপনার ফোনটি কমপক্ষে ১০ ফুট দূরে রাখুন।


কোন শখ এর পিছনে সময় দিন-
হতে পারে কবুতর লালনপালন বা গাছ রোপন করা যেকোনো একটি শখ বেচে নিন এবং শখ এর পিছনে সময় ব্যয় করুন দেখবেন আপনি অনেকটাই মোবাইল আসক্ত থেকে নিজেকে মুক্ত দিতে পারবেন।

অবসরে ঘুরতে যান-
সাধারণত আমরা ছুটির দিনগুলোতে মোবাইল বেশি চালাই । তাই এই অবসরে আপনি সুন্দর একটা পরিবেশে ঘুরতে যান। অথবা আপনি যেখানে থাকেন এর চারপাশে সুন্দর কোন জায়গায় থাকলে হাঁটতে বের হোন।

বিছানায় যাওয়ার আগে ফোন বন্ধ করুন-
ঘুমোতে যাওয়ার আগে আপনার মোবাইল কোন লকারে আটকে রাখুন অথবা আপনার পরিবারের কাছে মোবাইল দিয়ে রাখুন যাতে আপনি মোবাইলটি ব্যবহার না করতে পারেন রাত্রে বেলায়।

শেষ কথা
মাদকাসক্ত থেকে শুরু করে যেকোনো আসক্ত থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হচ্ছে নিজের স্ব-ইচ্ছায়। আপনি যখন নিজ থেকে ইচ্ছা পোষণ করবেন আপনি মোবাইল ব্যবহার কমিয়ে দেবেন আপনি আপনার কাজের প্রতি মনোযোগী হবেন তাহলে দেখবেন এই ক্ষেত্রে মোবাইল আসক্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য খুব বিরাট ভালো ভূমিকা পালন করবে। আমরা আশা করি আপনি মোবাইল আসক্তি থেকে বিরত থাকবেন এবং একটি সুন্দর জীবন উপভোগ করবেন।

আরো পড়ুন-

আপনি কী হতাশগ্রস্থ,একাকীত্ব,অবসাদগ্রস্থ? এই লেখাটি আপনার জন্য


Share This News

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *